Top News

দূষণে ধুঁকছে ঢাকা, বাড়ছে রোগ-বালাই

আলো-বাতাস চলাচল হয় না। কিন্তু দরজা-জানালা খুললে ধুলাবালি ঘরেও ঢুকে যায়। আমাদের বাসাবাড়ি নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হচ্ছে। তারপরও বায়ুদূষণের কারণে নানা রোগ-জীবাণু হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে ডায়াবেটিকস, এইড্‌স আক্রান্ত রোগী, শিশু, ট্রাফিক পুলিশদের।

বায়ুদূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের গবেষণা অনুযায়ী, শীতকালে বা শুষ্ক মৌসুমের নভেম্বর থেকে মার্চ- এই ৫ মাসে বায়ুদূষণ হয়ে থাকে ৫৭ শতাংশ। গবেষণা বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকার মানুষ মাত্র ৪৯ দিন নিরাপদ বাতাসে শ্বাস নিতে পেরেছে। চলতি বছরের নভেম্বরে ঢাকার মানুষ একদিনও স্বাস্থ্যকর বাতাসে শ্বাস নিতে পারেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষ বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যুবরণ করে। স্টেট অব গ্লোবাল এয়ারের (এসওজিএ) ২০২৪ সালের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়াসহ পূর্ব-পশ্চিম, মধ্য এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকার দেশগুলোতে বায়ুদূষণজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। শুধু ২০২১ সালেই বাংলাদেশে ২ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি মৃত্যুর কারণ ছিল এই বায়ুদূষণ, যা জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা বায়ুদূষণজনিত রোগের বেশি শিকার হয়ে থাকে। এর প্রভাবে অপরিণত অবস্থায় জন্মগ্রহণ, কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ, হাঁপানি ও ফুসফুসের রোগসহ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়। বাংলাদেশসহ আফ্রিকা এবং এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে লোয়ার রেসপাইরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা নিম্ন শ্বাসনালীর সংক্রমণে পাঁচ বছরের কমবয়সী যত শিশুর মৃত্যু হয়, তার ৪০ শতাংশের জন্যই দায়ী বায়ুদূষণ। ২০২১ সালে বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে ১৯ হাজারেরও বেশি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যু হয়। ২০২১ সালে বায়ুদূষণ সম্পর্কিত কারণে বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী ৭ লাখের বেশি শিশু মারা যায়। 

স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার ২০২৪’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাপী বাতাসের মানের উদ্বেগজনক অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা বায়ুদূষণজনিত রোগের শিকার হয়ে থাকে। এর প্রভাবে অপরিণত অবস্থায় জন্মগ্রহণ, কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ, হাঁপানি ও ফুসফুসের রোগসহ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়। বাংলাদেশে ব্যাপক হারে ওজোন গ্যাসের উপস্থিতি রয়েছে, যা বায়ুদূষণজনিত রোগের অন্যতম কারণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী ওজোন-সম্পর্কিত ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিসঅর্ডার (সিওপিডি) জনিত ২ লাখ ৩৭ হাজার মৃত্যু হয়েছে ভারতে, চীনে ১ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ এবং বাংলাদেশে ১৫ হাজার জনের মৃত্যু হয়েছে। বায়ুদূষণের ফলে শিশুদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা যায়; বায়ুদূষণের ক্ষতিকর এই প্রভাব, শিশু মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থাতেই শুরু হয়ে সারাজীবনের জন্য স্থায়ী হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুরা তাদের শরীরের ওজনের অনুপাতে বেশি বাতাস শ্বাস নেয়ার সময় গ্রহণ করে; দূষিত বায়ুর সঙ্গে তারা দূষিত সব উপাদানও গ্রহণ করে থাকে; যার মারাত্মক প্রভাব পড়ে তাদের বিকাশমান ফুসফুস, শরীর ও মস্তিষ্কের উপর।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, বায়ুদূষণে মানুষের শরীরে নানাভাবে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। দূষণ বায়ু গ্রহণের কারণে নানা ধরনের শ্বাসতন্ত্র রোগ হাঁচি, কাশি, নিউমোনিয়া, হাঁপানি ইত্যাদি হয়। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে শ্বাস নেয়ার কারণে ফুসফুসের ক্যান্সার হতে পারে। এটি ছোট-বড় সবার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে তবে ছোটদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া এবং শ্বাসের টান বেশি হয়। 

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, পৃথিবীতে হার্ট অ্যাটাকে মারা যাওয়া মানুষের মধ্যে চার ভাগের এক ভাগ হচ্ছে বায়ুদূষণের জন্য। বায়ুদূষণ আমাদের স্মায়ূতন্ত্রকে প্রভাবিত করে, মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে এবং এর প্রভাবে মেজাজ খিটখিটে থাকে। যে কোনো কাজে সঠিকভাবে মনোযোগ দেয়া যায় না। ব্লাড প্রেসার বেড়ে যায়, হার্টের উপরে চাপ পড়ে। এছাড়া দূষিত বায়ু থেকে বিভিন্ন ধরনের ভারি সিসা বা ভারি ধাতব পদার্থ এটি আমাদের শরীরের ভিতরে শোষিত হয়ে যায় বা ফুসফুসের মধ্য দিয়ে। তাছাড়া লিভার, কিডনিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। গর্ভস্থ শিশুর ওজন বৃদ্ধি ব্যাহত ও অসময়ে গর্ভপাতও হয় দূষিত বায়ুর কারণে। 

বায়ুদূষণজনিত রোগ থেকে উত্তরণের জন্য বায়ুদূষণের মাত্রা কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়ে লেলিন চৌধুরী বলেন, ঢাকাতে বায়ুদূষণের প্রধান উৎস হচ্ছে- নির্মাণ কাজ। ছোট-বড় মেগা প্রজেক্টসহ সমস্ত নির্মাণ কাজ থেকেই এই দূষণটা হয়ে থাকে। এছাড়া মটরযান থেকে নির্গত যে বাতাস-ধোঁয়া এগুলো থেকেও বায়ু দূষিত হয়। এটাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ফিটনেস ওয়ার্ক এবং এটি কমানোর এবং ফুচিং ফুয়েল কমানোর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একটি সুসংগঠিত রূপ দিতে হবে। জনগণকে সচেতন করতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকার, স্থানীয় সরকার এবং জনগণকে মিলে একটা উদ্যোগ নিতে হবে। সেই উদ্যোগে কতগুলো জায়গা খুবই গুরুত্বপূর্ণ রয়েছে। অমরা দেখি রাস্তাঘাটে ছোট ছোট যে পান-সিগারেটের দোকান তার চারপাশে নোংরা থাকে এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মানুষকে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস অর্জনের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ঢাকার চারপাশে যে ইটভাটা, কলকারখানা রয়েছে এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শহরের ভিতরে কোনো শিল্প-কারখানা রাখা যাবে না সব মিলিয়ে একটা উদ্যোগ নিলে বায়ুদূষণ থেকে পরিত্রাণ মিলবে।


Post a Comment

Previous Post Next Post